নাজীর আহম্মেদ খান| কালবিন্দু| শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিস্তার দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা ও বড় ঝুঁকি নিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট: জবস, এআই অ্যান্ড ট্রেড’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৭ শতাংশ চাকরি সরাসরি এআই প্রযুক্তির কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, প্রায় ১৫ শতাংশ চাকরি এআই প্রযুক্তির সাহায্যে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ পাবে। প্রতিবেদনের তথ্য মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) প্রকাশিত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এআই’র ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। কারণ এখানকার শ্রমবাজারে অনেকেই কম দক্ষ, হাতে-কলমে কাজ এবং কৃষিনির্ভর পেশায় নিযুক্ত। তবে ঝুঁকির প্রভাব সমানভাবে সকলের ওপর পড়বে না। বিশেষ করে মধ্যস্তর ও তরুণ কর্মীরা, যারা রুটিনধর্মী অফিস কাজ বা হালকা জ্ঞানভিত্তিক কাজে নিযুক্ত, তারা এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে চাকরি হারানোর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, “এআই মানবশ্রমের বিকল্প নয়, বরং সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করবে। দক্ষ ও উচ্চশিক্ষিত কর্মীরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পারবে। এই ক্ষেত্রে কর্মীরা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি মজুরি সুবিধা পেতে পারেন।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় এআই-এর ইতিবাচক প্রভাব বহুমুখী। বেসরকারি খাতে প্রযুক্তি গ্রহণ ও বিনিয়োগ সংস্কার সমন্বয় ঘটালে এটি উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্পে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। এতে দেশগুলোকে জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এআই-এর সম্ভাব্য প্রভাবের কিছু মূল দিক তুলে ধরা হয়েছে:
ঝুঁকিতে থাকা চাকরি: রুটিনধর্মী অফিস কাজ, হালকা জ্ঞানভিত্তিক কাজ ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে প্রতিস্থাপনযোগ্য পেশায় নিযুক্ত তরুণ ও মাঝারি শিক্ষিত কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি: দক্ষ ও উচ্চশিক্ষিত কর্মীরা এআই-এর সাহায্যে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবে এবং বৈষয়িক সুবিধা পাবে।
নতুন কর্মসংস্থান: যদি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংস্কার ও এআই গ্রহণকে কার্যকরভাবে সমন্বিত করা যায়, তবে উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্পে নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, বিশেষ করে ব্যাংকিং, আইটি, স্বাস্থ্য ও উৎপাদন খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে চাকরি রক্ষা ও দক্ষতার উন্নয়নের জন্য নীতিনির্ধারকদের আগে থেকে পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শ্রমশক্তির দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি গ্রহণের সমন্বিত নীতি এ অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তি শুধুমাত্র ঝুঁকি নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করবে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিকে কেবল চাকরি সংরক্ষণে নয়, বরং নতুন কর্মসংস্থান এবং উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন পেশার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা উপদেশ দিচ্ছেন, “এআই গ্রহণের সঙ্গে শ্রমবাজার নীতিমালা, শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণকে মিলিয়ে নিতে হবে। এতে ঝুঁকি কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি সম্ভব হবে।”
এআই প্রযুক্তির এই দ্বৈত প্রভাব—ঝুঁকি ও সুযোগ—দক্ষিণ এশিয়ার নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশসহ অঞ্চলের দেশগুলোকে এখন প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধি ও শ্রম নীতি উন্নয়নে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে এআই থেকে সর্বাধিক অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করা যায়।