MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
যুদ্ধ শুধু রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর আসল ফলাফল নির্ধারিত হয় শক্তির নতুন ভারসাম্যে। গত এক বছর ধরে ইরানের ওপর সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধযন্ত্র ব্যবহার করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক প্রক্সি শক্তি, তার ফলাফল এখন সম্পূর্ণ উল্টো দিকে মোড় নিয়েছে। ইরানকে খণ্ড-বিখণ্ড করা এবং ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে ছক ওয়াশিংটন কষেছিল, তা আজ এক চরম ও সামগ্রিক কৌশলগত ব্যর্থতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। মাত্র ১০ মাসেরও কম সময়ে তিনটি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধকে রুখে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এক অপরাজেয় বিশ্বশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ইরান। আজ পারস্য উপসাগরে মার্কিন সাম্রাজ্য ক্ষয়িষ্ণু ও পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। এটি কেবল কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং বিশ্বরাজনীতিতে মার্কিন একক আধিপত্যের পতন এবং পরাশক্তি হিসেবে ইরানের এক নতুন যুগের সূচনা—যা বিশ্বব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের দম্ভোক্তি ও শত্রুর জোড়া ভুল হিসাব: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যে তৃতীয় যুদ্ধটি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী ইরানের জাতীয় শক্তি সম্পর্কে চরম ভুল ধারণার মধ্যে ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই তেহরানে একটি নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণের বিষয়ে খোলোখেলি আস্ফালন করেছিলেন। দাবি করা হয়েছিল—ইরানিরা শিগগিরই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের জন্য অনুরোধ করবে, ৪৭ বছর আগের অসমাপ্ত কাজ এবার শেষ হবে এবং ইরানের সমস্ত তেল দখল করা হবে। কিন্তু ৪০ দিনের এই তৃতীয় যুদ্ধের প্রতিটি দিন সেই সমস্ত অহংকারকে বিপর্যয়করভাবে ভুল প্রমাণ করেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শত্রুর এই সামগ্রিক ব্যর্থতার উৎস ছিল দুটি মৌলিক ভুল হিসাব:
প্রথমত, আমেরিকা নিজেদের তৈরি স্থূল প্রোপাগান্ডার ওপর মাত্রাতিরিক্ত অন্ধবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। তারা ভেবেছিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো জনরোষ ছাড়াই তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয়ত, তারা ইরানের প্রকৃত সক্ষমতাকে পদ্ধতিগতভাবে খাটো করে দেখেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি, অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধনীতি (Asymmetric Warfare), এবং প্রতিরোধ ফ্রন্ট (Resistance Front)-এর গভীর আঞ্চলিক প্রভাবকে হিসাবেই ধরেনি। যার ফলে ইসরায়েলি বাহিনী এখন দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর কৌশলগত জালে এমনভাবে আটকে গেছে যেখান থেকে সম্মানজনকভাবে পিছু হটার কোনো পথ নেই।
হরমুজ প্রণালীতে মার্কিনীদের পরাজয় ও ১০ মাসে ৩টি যুদ্ধ: হরমুজ প্রণালী নিয়ে দ্বন্দ্বের সময় মার্কিন যুদ্ধযন্ত্রের কৌশলগত বিভ্রান্তি ও অসহায়ত্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। বৈধ আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে এই জলপথ অবরুদ্ধ করার জন্য ইরানের দৃঢ় ও আইনসম্মত পদক্ষেপের মুখোমুখি হয়ে, মার্কিনীরা বারবার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে স্ববিরোধিতার পরিচয় দিয়েছে। প্রথমে তারা অবিলম্বে প্রণালীটি মুক্ত করার দাবি করলেও, পরে ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে সামরিক সহায়তার আহ্বান জানায়। সবশেষে, একটি নৌ-এসকোর্টের (পাহারা) মাধ্যমে ৩০টি বাণিজ্যিক জাহাজকে প্রণালী থেকে বের করার যে শেষ চেষ্টা আমেরিকা চালায়, সেই অভিযানটিও মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয় এবং পাহারায় থাকা মার্কিন নৌ-সম্পদের গুরুতর ক্ষতি হয়। মাত্র ১০ মাসেরও কম সময়ে ইরান তিনটি ভিন্ন ফ্রন্ট থেকে সম্পূর্ণ বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে; যার মধ্যে রয়েছে—১২ দিনের যুদ্ধ, জানুয়ারির অভ্যুত্থান চেষ্টা এবং সাম্প্রতিক এই ৪০ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ।
কূটনৈতিক সমীকরণ ও ইরানের অলঙ্ঘনীয় ‘লাল রেখা’: এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এক বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান এক অনস্বীকার্য ‘কৌশলগত বিজয়’ অর্জন করেছে। তবে একই সাথে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রের এই অর্জনগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী রূপ দিতে হবে। তবে তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মতে, ইরান যদি ভবিষ্যতে কোনো চুক্তিতে অংশ নেয়ও, তবে তার শর্তগুলো অবশ্যই এই নতুন শক্তির ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করেই হতে হবে, যেখানে নিচের বিষয়গুলো সম্পূর্ণ আপসহীন বা রেড লাইন: ১. হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণ ও অখণ্ড সার্বভৌমত্ব কোনো শর্ত ছাড়াই মেনে নিতে হবে। ২. ইরানের আত্মরক্ষা ও জাতীয় ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করার কোনো মার্কিন দাবি গ্রহণযোগ্য হবে না। ৩. মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসনে ইরানের যে শত শত বিলিয়নের অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, তার আনুষ্ঠানিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
দেশীয় শক্তিতে বিশ্বজয়ের ঘোষণা ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ: শুধু কূটনৈতিক ফ্রন্টই নয়, ইরানের সামরিক নেতৃত্বও আজ শত্রুর সমস্ত হিসাব-নিকাশ চূর্ণ হওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। ইরানের খাতামুল আম্বিয়া (সা.) কেন্দ্রীয় সদরদপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি এক বিশেষ বার্তায় বলেছেন, "নিষ্ঠুর ও লুণ্ঠনকারী শত্রুরা ভেবেছিল, ইরানি সেনাবাহিনীর দক্ষ অফিসারদের হত্যা করে তারা ইরানের প্রতিরক্ষা সংকল্পে ফাটল ধরাতে পারবে। কিন্তু মাতৃভূমির একনিষ্ঠ রক্ষাকারীরা আজ ‘আমরা এটা করতে পারি’—এই দেশীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ।" তিনি আরও যোগ করেন, ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা হোসেইনি খামেনেই-এর নীতি ও নির্দেশনার অধীনে ইরানিরা সবসময় রণাঙ্গনে অবিচল থাকবে।
তবে নেতৃত্বের এই আত্মবিশ্বাসী বার্তার পরও ইরানের নীতিনির্ধারকদের এটা মনে রাখতে হবে যে, যেকোনো চুক্তিই শেষ কথা নয়; বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো এক চরম অবিশ্বাস্য শত্রুর সাথে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের শুরু মাত্র। আমেরিকা সরাসরি সামরিক হামলা থেকে পিছিয়ে এসে এখন নতুন ফাঁদ পাতবে। তাই এই ঐতিহাসিক বিজয়কে ধরে রাখতে ইরানকে এখন ঘরের ভেতরের অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। ১২ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের এক বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আজ ইরান প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃত নিরাপত্তা কোনো চুক্তি বা বিদেশি আশ্বাসে আসে না, তা আসে কেবলই নিজস্ব আত্মশক্তি ও প্রতিরোধের ক্ষমতা থেকে।