MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
বিশ্বের বিরল ও প্রাণঘাতী ‘সিস্টিক ফাইব্রোসিস’ (সিএফ) রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যের জেনেরিক ওষুধ সরবরাহ শুরু করে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবায় এক নতুন ও গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক স্থাপন করেছে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি।
গতকাল সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর অদূরে টঙ্গীতে অবস্থিত বেক্সিমকো ফার্মা কারখানা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং সাউথ আফ্রিকাসহ বিশ্বের ছয়টি দেশের আক্রান্ত রোগী ও তাদের অফিশিয়াল প্রতিনিধিদের হাতে জীবনরক্ষাকারী এই ওষুধটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘রাইট টু ব্রিদ’-এর প্রতিনিধিসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
বেক্সিমকো ফার্মা মূলত ‘ট্রিকো’ (TRIKO) নামে ইলেক্সাক্যাফটর, টেজাক্যাফটর ও আইভাক্যাফটরের সমন্বয়ে তৈরি একটি ট্রিপল কম্বিনেশন ওষুধ বাজারে এনেছে। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত ভার্টেক্স ফার্মাসিউটিক্যালস (Vertex Pharmaceuticals)-এর উদ্ভাবিত যুগান্তকারী ওষুধ ‘ট্রিকাফটা’ (Trikafta)-এর জেনেরিক সংস্করণ। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বের হাজারো অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগীর জন্য জীবনরক্ষাকারী অত্যন্ত ব্যয়বহুল এ চিকিৎসা এখন নাগালের মধ্যে চলে আসবে।
পেটেন্ট ছাড় ও অবিশ্বাস্য মূল্য হ্রাস: সিস্টিক ফাইব্রোসিস একটি বিরল এবং প্রাণঘাতী বংশগত রোগ, যা ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রে ঘন শ্লেষ্মা জমিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্তব্ধ করে দেয়। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে মূল ব্র্যান্ডের ওষুধ ট্রিকাফটার মাধ্যমে চিকিৎসা করতে একজন রোগীর বার্ষিক খরচ হয় প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৪ কোটি টাকারও বেশি), যা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস (TRIPS) চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ এলডিসিভুক্ত দেশ হওয়ায় ওষুধের পেটেন্ট সুরক্ষা কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পায়। এই আইনি সুযোগকে কাজে লাগিয়েই বেক্সিমকো ফার্মা এই জেনেরিক সংস্করণটি প্রস্তুত করেছে।
আমেরিকান ব্র্যান্ডেড ওষুধের তুলনায় বেক্সিমকো তাদের জেনেরিক সংস্করণ ‘ট্রিকো’র বার্ষিক মূল্য নির্ধারণ করেছে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মাত্র ১২ হাজার ৭৫০ ডলার এবং শিশুদের জন্য মাত্র ৬ হাজার ৩৭৫ ডলার—যা যুক্তরাষ্ট্রের মূল বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় ৯৬ শতাংশ কম! প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, ব্র্যান্ডেড ওষুধে যেখানে মাত্র একজন শিশুর চিকিৎসা সম্ভব, বেক্সিমকোর ট্রিকোর মাধ্যমে সমপরিমাণ খরচে ৫৮ জন শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ‘বেক্সডেকো’ (BEXDECO) নামে আইভাক্যাফটরের আরেকটি জেনেরিক সংস্করণও বাজারে এনেছে, যার প্রতি ট্যাবলেটের দাম রাখা হয়েছে মাত্র ৫ ডলার।
প্রাথমিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক ‘সিএফ বায়ার্স ক্লাব’-এর মাধ্যমে বিশ্বের সুনির্দিষ্ট রোগীদের কাছে এই ওষুধ সরবরাহ করা হবে। পরবর্তীতে উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবঞ্চিত সব মানুষের কাছে এই সাশ্রয়ী চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
অনুষ্ঠানে ‘রাইট টু ব্রিদ’ গ্লোবাল ক্যাম্পেইনের নেত্রী এবং সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত এক শিশুর মা গেইল প্লেজার বলেন, "উচ্চমূল্যের কারণে এই যুগান্তকারী ওষুধগুলো বিশ্বের অধিকাংশ রোগীর নাগালের বাইরে ছিল। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোগী ও অধিকার সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে বেক্সিমকো ফার্মা যে সাহস দেখিয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়।"
বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) রাব্বুর রেজা বলেন, "বেক্সিমকো ফার্মা সবসময়ই আন্তর্জাতিক রোগীদের অপূর্ণ চিকিৎসা চাহিদা পূরণে কাজ করে আসছে, বিশেষ করে যেসব রোগের ক্ষেত্রে কার্যকর চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। এই অর্থবহ মানবিক উদ্যোগের অংশ হতে পেরে আমরা গর্বিত। আমাদের বিশ্বাস, এই জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সহজলভ্য হওয়ায় বিশ্বজুড়ে সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত হাজারো অসহায় রোগীর জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।"