MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
এমন কোনো সংবেদনশীল কথা হঠাৎ আপনার কানে এল, যা কাউকে বলা যাবে না। আপনিও অবলীলায় প্রতিশ্রুতি দিলেন, ‘কাকপক্ষীতেও টের পাবে না!’ কিন্তু কিছু সময় পার হতেই মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হলো। মনে হতে লাগল, কাউকে না বললে যেন শান্তিই মিলছে না। শেষ পর্যন্ত সেই মানসিক চাপ আর চেপে রাখতে না পেরে অন্য কাউকে বলেই ফেললেন সেই পরম গোপন কথাটি। এই অভিজ্ঞতা আমাদের সমাজে অনেকের কাছেই ভীষণ পরিচিত। কিন্তু কেন এমন হয়? কেন কেউ কেউ গোপন কথা সহজে নিজের মধ্যে চেপে রাখতে পারেন না?
মনোবিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে মূলত কাজ করে তীব্র মানসিক চাপ, আবেগের তীব্র দ্বন্দ্ব এবং মানুষের ভেতরের এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তি। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মনোবিদরা চমৎকার কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তাদের মতে, গোপন কথা চেপে রাখা মানে শুধু মুখে কুলুপ এঁটে চুপ করে থাকা নয়, এটি মস্তিষ্কে এক ধরণের নেতিবাচক মানসিক ভার বা অবচেতন চাপ তৈরি করে। কারও গোপন কথা জানার অর্থ হলো একটি অদৃশ্য নৈতিক দায়িত্ব বহন করা। কেউ যদি সেই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারেন, তবে সমাজে তাকে ভরসাযোগ্য মনে করা হয়। আর যিনি পারেন না, সমাজে তাঁর প্রতি মানুষের আস্থাও দ্রুত কমে যেতে পারে।
কগনিটিভ ডিসোন্যান্স বা মানসিক টানাপড়েন: মনোবিদরা জানিয়েছেন, অনেক সময় মানুষ একইসঙ্গে দুটি বিপরীতধর্মী অনুভূতির গোলকধাঁধায় পড়ে যান। একদিকে নৈতিকতার খাতিরে তিনি কথাটি গোপন রাখতে চান, অন্যদিকে মনের কৌতূহল বা ভালো লাগা থেকে সেটি অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে এই জটিল অবস্থাকে বলা হয় ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’ (Cognitive Dissonance)।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়— ধরুন দু’জন মানুষ একটি সম্পর্কে রয়েছেন। একজন সামাজিক কারণে চান সম্পর্কটি সম্পূর্ণ গোপন থাকুক, অন্যজন আনন্দের এই খবরটি তাঁর খুব কাছের মানুষদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান। কিন্তু সঙ্গীর ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তিনি জোর করে চুপ থাকছেন। এই দীর্ঘস্থায়ী টানাপড়েনই মনে তীব্র অস্বস্তি তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো গোপন বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় একা একা ভাবতে থাকলে তা মানুষের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে বাড়তে পারে তীব্র উদ্বেগ, অপরাধবোধ এবং মানসিক বিষণ্ণতা। অনেকের কাছেই একা এই মানসিক চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অবচেতনভাবেই মনের ভার ও চাপ কমাতে তারা বিশ্বস্ত কাউকে না কাউকে কথাটি বলে ফেলেন। আর গোপন কথাটি ফাঁস করে দেওয়ার পর অনেকেই এক ধরণের সাময়িক স্বস্তি বা হালকা অনুভব করেন। কারণ তখন আর নিজেকে আটকে রাখার বা লুকিয়ে রাখার যুদ্ধটা করতে হয় না।
তবে বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে কঠোর সতর্কও করছেন। ক্ষণিকের আবেগের বশে বা মনের ভার কমাতে সব কথা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। হঠাৎ অসচেতনভাবে বলে ফেলা কোনো গোপন কথা আজীবনের একটি সুন্দর সম্পর্কের চিরতরে ক্ষতি করতে পারে বা নতুন কোনো বড় সামাজিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে। তাই কোথায়, কাকে, কখন এবং কতটা বলা উচিত, সেই আত্মসচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রতিটি মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি।