No Name | Times News 24 | Fast Online News Portal | শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের আগ্রাসন শুরুর দুই বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার জেরে শুরু হয় ইসরাইলের ব্যাপক সামরিক অভিযান, যা এখনো অব্যাহত। দুই বছরে এই অভিযানে গাজায় ফেলা হয়েছে প্রায় দুই লাখ টনেরও বেশি বিস্ফোরক, নিহত হয়েছেন ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ, আর নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় দশ হাজার। ভয়াবহ ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি, দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয়ে আজ কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা।
লেবাননের সংবাদমাধ্যম আল মায়েদিন জানিয়েছে, গাজার সরকারী গণমাধ্যম কার্যালয় আগ্রাসনের দুই বছর উপলক্ষে এক বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইসরাইলের হামলায় গাজায় গণহত্যা, অবকাঠামো ধ্বংস এবং জাতিগত নিধনের নীতি অনুসৃত হচ্ছে।
দুই বছরে মৃত্যুর মিছিল
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭৬ হাজার ৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৭ হাজার ১৩৯ জনের মৃত্যু হাসপাতাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় সাড়ে ৯ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ, যাদের অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিহতদের অর্ধেকের বেশি নারী, শিশু ও প্রবীণ। ২০ হাজারের বেশি শিশু এবং ১২ হাজার ৫০০ নারী এই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এমন ঘটনার সংখ্যা ২ হাজার ৭০০টিরও বেশি। আরও ৬ হাজার পরিবারের মধ্যে কেবল একজন সদস্য জীবিত আছেন।
অবকাঠামো ধ্বংস ও মানবিক বিপর্যয়
গাজা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরের বোমাবর্ষণে গাজার অবকাঠামোর ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসরাইলি বাহিনী গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভূমি দখল করে নিয়েছে। দুই বছরে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের অনেকেই একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইল কেবল সামরিক অভিযানই নয়, বরং গাজায় ক্ষুধা ও অবরোধের মাধ্যমে জাতিগত নিধনের নীতি চালাচ্ছে। দুই বছরে উপত্যকাটিতে ২ লাখ টনেরও বেশি বোমা ও বিস্ফোরক নিক্ষেপ করা হয়েছে। মানবিক সহায়তার জন্য নির্ধারিত তথাকথিত ‘নিরাপদ এলাকা’ আল–মাওয়াসিতে ১৩০ বারের বেশি বোমা হামলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয়
ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৩৮টি হাসপাতাল ও ৯৬টি ক্লিনিক ধ্বংস হয়েছে বা অচল হয়ে পড়েছে। ১৯৭টি অ্যাম্বুলেন্স টার্গেট করে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। এতে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন।
এছাড়া, ২৫৪ জন সাংবাদিক, ১৪০ জন সিভিল ডিফেন্স সদস্য এবং ৫৪০ জন মানবিক সহায়তাকর্মী হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
দুই বছরে ১ লাখ ৬৯ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, কিন্তু চিকিৎসা সেবার ঘাটতির কারণে তাদের অধিকাংশই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না। হাসপাতালগুলো ওষুধ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতিতে কার্যত অচল। বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি পাওয়া ২২ হাজার রোগী এখনো গাজার ভেতরেই আটকা রয়েছেন।
গাজার ৬ লাখ ৫০ হাজার শিশু বর্তমানে মারাত্মক খাদ্যসংকটে ভুগছে। দুধ, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে তাদের জীবন হুমকির মুখে। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে গাজায় দুর্ভিক্ষের সতর্কতা দিয়েছে।
শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও ধ্বংসযজ্ঞ
গাজার গণমাধ্যম কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, ইসরাইলি হামলায় ৯৫ শতাংশ বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৬৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। নিহত হয়েছেন ১৩ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী, ৮৩০ শিক্ষক এবং প্রায় ২০০ গবেষক ও শিক্ষাবিদ।
ধর্মীয় স্থানগুলোর অবস্থা আরও করুণ। পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে ৮৩৫টি মসজিদ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকটি গির্জা। এমনকি কবরস্থানও বুলডোজার ও বোমা হামলায় ধ্বংস করা হয়েছে। গাজার মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চলছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও নিন্দা
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একাধিকবার গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে, গাজার ২৪ লাখ মানুষের প্রায় সবাই এখন মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এবং তারা ‘অভূতপূর্ব বঞ্চনার শিকার’।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার এক বিবৃতিতে বলেন—
“গাজায় যা ঘটছে, তা আধুনিক যুগের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধবিধি এখানে সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।”
তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা সত্ত্বেও ইসরাইল তাদের সামরিক অভিযান থামায়নি। তারা দাবি করছে, এটি হামাস নির্মূলের যুদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ নিরস্ত্র মানুষ, যাদের মধ্যে শিশু ও নারী সংখ্যাগরিষ্ঠ।
গাজার ভয়াল বাস্তবতা
দুই বছর ধরে চলমান এই যুদ্ধ গাজার মানুষকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত, হাসপাতালগুলো অচল, খাদ্য ও পানির অভাব চরমে। শিশুরা স্কুল হারিয়েছে, পরিবারের সদস্য হারিয়েছে, হারিয়েছে নিরাপত্তা ও আশার আলো।
ফিলিস্তিনি সাংবাদিক হানা আবু সালেহ এক সাক্ষাৎকারে বলেন—
“আমরা এখন শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। আকাশে প্রতিদিন বোমা পড়ে, মাটিতে কবর ফুরিয়ে গেছে। গাজা এখন মৃত্যুর উপত্যকা।”
দুই বছরে গাজার চিত্র যেন পৃথিবীর বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো। ২ লাখ টন বিস্ফোরক, ৬৭ হাজারের বেশি মৃতদেহ, লাখো আহত, ধ্বংসপ্রাপ্ত হাসপাতাল, স্কুল, মসজিদ সব মিলিয়ে গাজা এখন এক বিশাল শোকের জনপদ।
জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতাদের বারবার আহ্বান সত্ত্বেও ইসরাইলের আগ্রাসন বন্ধ হয়নি। মানবিক সংকট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আধুনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।
বিশ্ববাসী অপেক্ষায় এই রক্তপাতের অবসান কবে হবে, গাজার শিশুদের আবার কবে শান্তির আকাশ দেখা হবে।