MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরান ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটি মাঠের ফুটবলের চেয়েও বেশি বৈশ্বিক আলোচনায় উঠে এসেছে গ্যালারিতে প্রদর্শিত ইরানের পতাকা নিয়ে। আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ামক সংস্থা ফিফার কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কেন প্রবাসী ইরানিরা একটি বিশেষ পতাকা নিয়ে মাঠে সরব এবং কেনই বা তেহরান সরকার একে ঘিরে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে—এর পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস এবং আদর্শিক বিভাজন।
দুই পতাকার ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব: ইরানের জাতীয় পতাকার মূল দৃশ্যমান কাঠামো অর্থাৎ ওপর থেকে নিচে যথাক্রমে সবুজ, সাদা ও লাল রঙের অনুভূমিক পটভূমিটি বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই অবিচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে। তবে মূল দ্বন্দ্ব ও আপত্তির জায়গাটি হলো পতাকার ঠিক কেন্দ্রে থাকা প্রতীকটিকে ঘিরে। ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের পতাকার কেন্দ্রে ছিল প্রাচীন পারস্যের ঐতিহ্যের ধারক ‘সিংহ ও সূর্য’ (Lion and Sun) প্রতীক, যা মূলত তৎকালীন শাহী শাসন বা পাহলভি রাজবংশের পরিচায়ক ছিল।
অন্যদিকে, ১৯৮০ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর পতাকায় সম্পূর্ণ নতুন নকশা গ্রহণ করা হয়, যেখানে রাজতান্ত্রিক প্রতীক বাদ দিয়ে ইসলামি ‘তাকবির’ বা ক্যালিগ্রাফি খচিত ‘আল্লাহু আকবার’ যুক্ত করা হয়। বর্তমানে এটিই জাতিসংঘের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং ফিফার অফিশিয়াল নিয়মানুযায়ী মাঠের একমাত্র বৈধ পতাকা।
প্রবাসী বনাম তেহরান সরকার ও ফিফা: বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রায় সাড়ে সাত লাখের বেশি ইরানি প্রবাসীর একটি বড় অংশের কাছে এখনকার অফিশিয়াল সরকারি পতাকাটি তেহরান সরকারের দমন-পীড়নের প্রতীক। তাদের মতে, বর্তমান শাসকরা সাধারণ ইরানিদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করে না। তাই তারা নিজেদের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও স্বাধীনতার লড়াইয়ের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বিপ্লব-পূর্ববর্তী ‘সিংহ ও সূর্য’ খচিত পতাকাকেই বেছে নিয়েছেন। তাদের কাছে ফুটবল মাঠটি কেবল খেলার জায়গা নয়, বরং বিদেশের মাটিতে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে নিজেদের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দেওয়ার এক বড় বৈশ্বিক মঞ্চ।
বিপরীত দিকে, ফিফা তার কঠোর আচরণবিধি অনুযায়ী ফুটবল মাঠে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আপত্তিকর প্রতীক প্রদর্শনের ওপর চিরতরে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। ফিফার সাফ যুক্তি হলো—আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে কেবল একটি দেশের বর্তমান বৈধ সরকারি পতাকাই প্রদর্শিত হতে পারে। এদিকে তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী মনে করে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিপ্লব-পূর্ববর্তী পতাকা প্রদর্শন বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে সরাসরি অস্বীকার ও অবমাননা করার নামান্তর। যে কারণে ইরান ফুটবল ফেডারেশন ও দেশটির ক্রীড়ামন্ত্রণালয় বারবার ফিফাকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, গ্যালারিতে এই নিষিদ্ধ পতাকা প্রদর্শিত হলে তা তাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর বড় আঘাত। মাঠের এই পতাকা-যুদ্ধ আগামী ম্যাচগুলোতেও ইরানকে কেন্দ্র করে বাড়তি রাজনৈতিক উত্তেজনা জিইয়ে রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।