লাভলু সরকার| কালবিন্দু| বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের জনগণের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন থেকে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “জনগণের প্রত্যাশিত একটি নির্বাচন যখন অনুষ্ঠিত হবে, তখন জনগণের মাঝেই থাকব, ইনশাল্লাহ।”
সোমবার প্রচারিত এ সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান তার দেশে ফেরা, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, দলের কৌশল, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও বিচারপ্রক্রিয়া, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানসহ সমসাময়িক নানা বিষয়ে খোলামেলা বক্তব্য দেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে দেওয়া এ সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বিগত স্বৈরাচার সরকারের সময় আদালতের আদেশে তার কথা বলার অধিকার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। “আমি যদি গণমাধ্যমে কিছু বলতে চাইতাম, হয়তো তাদের ইচ্ছা ছিল ছাপানোর; কিন্তু তারা পারত না,” বলেন তিনি।
নিজ
দেশে ফেরার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “কিছু সংগত কারণে
দেশে ফেরা এখনো সম্ভব
হয়নি, তবে সময় এসেছে
মনে হচ্ছে। ইনশাল্লাহ দ্রুতই ফিরে আসব।” তিনি
আরও জানান, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন
থাকার প্রশ্নই ওঠে না। “জনগণের
প্রত্যাশিত একটি নির্বাচনের সময়
দূরে থাকা সম্ভব নয়,”
মন্তব্য করেন তিনি। ব্যক্তিগত
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নে তিনি
বলেন, “বিভিন্ন সময় সরকারের অনেক
ব্যক্তির কাছ থেকেও শঙ্কার
কথা শুনেছি, বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে।” তবে এসব শঙ্কা
তাকে জনগণের কাছ থেকে দূরে
রাখতে পারবে না বলেই জানান
বিএনপি নেতা।
আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা এমন ব্যক্তিকেই প্রার্থী করতে চাই, যিনি এলাকার মানুষ ও সমস্যার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তরুণ, নারী, প্রবীণ, ছাত্র সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে যার যোগাযোগ আছে, তিনিই অগ্রাধিকার পাবেন।”
নির্বাচনে তার নিজস্ব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী। জনগণসম্পৃক্ত একটি নির্বাচনে আমি দূরে থাকতে পারব না। মাঠে থাকব ইনশাল্লাহ।” তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বলেন, “এটি নির্ভর করবে বাংলাদেশের জনগণ ও দলের সিদ্ধান্তের ওপর।”
দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনে ভূমিকা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যদি এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তার শারীরিক অবস্থা অনুমতি দেয়, তিনি নিশ্চয়ই ভূমিকা রাখবেন।”
বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে পরিবারের প্রভাব থাকবে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “রাজনীতি পরিবারকরণ নয়, সমর্থনের ভিত্তিতে টিকে থাকে। যিনি জনগণকে সংগঠিত করতে পারবেন, তিনিই নেতৃত্ব দেবেন।” স্ত্রী বা পরিবারের অন্য কেউ রাজনীতিতে আসবেন কি না এ বিষয়ে তার বক্তব্য, “সময় ও পরিস্থিতি বলবে।”
২০২৪
সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে
তারেক রহমান বলেন, “এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড
কোনো ব্যক্তি নয়, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী
জনগণ।” তিনি জানান, আন্দোলনে
শিশুসহ হাজারো মানুষ প্রাণ দিয়েছে। “এই আন্দোলনে ৬৩
শিশু শহীদ হয়েছে, ২
হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত,
৩০ হাজারের মতো আহত বা
পঙ্গু হয়েছে। এদের পরিবারগুলোর পাশে
সরকারের ও রাজনৈতিক দলগুলোর
দাঁড়ানো উচিত।”
তারেক রহমান বলেন, “জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের জনগণের। কেউ হয়তো দাবি করতে পারে, কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী এটি জনগণের আন্দোলন।”
নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতেই হবে বলে সরকার যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তাতে আস্থা প্রকাশ করে বিএনপি নেতা বলেন, “একটি নির্বাচন হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে এমন নয়। তবে ধীরে ধীরে সঠিক দিকেই অগ্রসর হবে দেশ। আমরা চাই, সরকার নির্বাচনের আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুক।”
নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে না জোটবদ্ধভাবে অংশ নেবে এই প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, “যে দলগুলো রাজপথে আমাদের সঙ্গে ছিল, আমরা চাই রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে।” জামায়াতে ইসলামী নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী যারা রাজনীতি করতে পারে, তাদের অধিকার রয়েছে। আমরা বহুদলীয় রাজনীতিতে বিশ্বাস করি, সবাই রাজনীতি করুক এটাই আমাদের অবস্থান।”
দুর্নীতির
প্রশ্নে বিএনপি কীভাবে জনগণকে আশ্বস্ত করবে এমন প্রশ্নে
তিনি বলেন, “দুর্নীতি এখন সামাজিক ব্যাধি।
এটি দূর করতে সময়
লাগবে। কথায় নয়, কাজে
প্রমাণ করতে হবে যে
আমরা ভিন্ন।” ডাকসুর নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে কি না এমন
প্রশ্নে তিনি বলেন, “ছাত্ররাজনীতি
তার জায়গায়, জাতীয় রাজনীতি তার জায়গায়। দুটোকে
একসঙ্গে দেখা ঠিক নয়।”
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ বিষয়ে তিনি বলেন, “যদি
দল বা তাদের নেতারা
অন্যায় করে থাকে, দেশের
আইনের মাধ্যমেই বিচার হবে। অন্যায়কারী ব্যক্তি
হোক বা দল বিচার
হতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের রাজনীতির সব ক্ষমতার উৎস জনগণ। যে দল গুম-খুন, লুটপাট ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, জনগণ তাদের সমর্থন করবে বলে আমি মনে করি না। জনগণই চূড়ান্ত বিচারক।”
তারেক
রহমান বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে যারা
গুম-খুন, লুটপাট, দমন-নিপীড়নে যুক্ত ছিল, তাদের প্রত্যেককে
জবাব দিতে হবে। কেউ
৭১-এ অন্যায় করে
থাকলে তারও জবাব দিতে
হবে। তবে অন্যের দায়
আমি নিতে পারি না;
নিজের দায় আমি নেব।”
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতি এখন একটি পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনগণ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে জেগে উঠেছে। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন।” বিএনপি নেতা জানান, রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তিনি দলমত নির্বিশেষে সবার সহযোগিতা চান। “আমরা চাই, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক, গণতন্ত্র ফিরে আসুক। জনগণের রায়ই আমাদের শক্তি,” বলেন তারেক রহমান।
দীর্ঘ
বিরতির পর গণমাধ্যমে মুখ
খোলা তারেক রহমানের এই সাক্ষাৎকার রাজনৈতিক
অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম
দিয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করলেও
তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘোষণা
ও নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে
নতুন আশার সঞ্চার করেছে।