MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মাথায় ব্যাপক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে অপসারণ করা হয় মোহাম্মদ এজাজকে। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাকে প্রশাসকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর বিদায়ের পর একে একে বেরিয়ে আসছে নাগরিক সেবার জন্য বরাদ্দ অর্থের অবিশ্বাস্য হরিলুট, বেনামে ঐচ্ছিক তহবিল ফাঁকা করা, তড়িঘড়ি করে শত শত দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান এবং নিয়মবহির্ভূত দোকান বরাদ্দের মতো পিলে চমকানো সব দুর্নীতির চিত্র। নানা অনিয়মে সিদ্ধহস্ত এই সাবেক প্রশাসককে এখন করপোরেশনের কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীরা অভিহিত করছেন ‘নগরখেকো নগরপিতা’ হিসেবে।
ঐচ্ছিক তহবিল যেন ব্যক্তিগত উপহারের খাতা: অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এজাজ দায়িত্ব নেওয়ার সময় মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিলে অর্থ ছিল ৮ কোটি ৪৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। এর আগের সাড়ে ৮ মাসে যেখানে খরচ হয়েছিল মাত্র ৫৫ লাখ ৩৩ হাজার টাকা (মাসিক গড় ৬.৫ লাখ), সেখানে এজাজ চেয়ারে বসেই মাত্র সাড়ে ৩ মাসে খরচ করেন ২ কোটি ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাসিক খরচ দাঁড়ায় ৬০ লাখ ৪০ হাজার টাকার বেশি, যা আগের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ! এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৮ মাসে তিনি রেকর্ড ৭ কোটি ২২ লাখ টাকা স্রেফ ঐচ্ছিক তহবিল থেকে উধাও করেন।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএনসিসির ৭১ জন চালক, কার্যালয়ের ৩২ জন কর্মীসহ বিভিন্ন বিভাগের ৮৪ কর্মচারীকে নিয়মিত বেতন-বোনাস পাওয়ার পরও আপৎকালীন সহায়তার নামে লাখ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এমনকি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মচারীদেরও ‘ঈদ সালামি’র নামে এই তহবিল থেকে অর্থ বিলানো হয়েছে। করপোরেশনের অফিস সহকারী সোহেল রানাকেই নিজের বিয়ে, মায়ের চিকিৎসা ও ঈদের নাম করে কয়েক দফায় দেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা! এছাড়া আব্দুস সামাদ নামে একজনের ক্যান্সারের চিকিৎসার নামে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে পাশে কেবল ‘ছেলে’ ও ‘মামা’ লিখে, যাদের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র বা পূর্ণাঙ্গ তথ্য নথিতে নেই। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ভুয়া কর্মী সাজিয়ে মো. রিফাত হাওলাদার নামে একজনকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে, যার নথিতে দেওয়া মোবাইল নম্বরটি ১২ ডিজিটের (ভুল নম্বর)। মূলত প্রশাসকের পদে টিকে থাকতে নিজের অনুগত একটি বলয় তৈরি করতে নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই অর্থ ছড়ানো হয়।
অবৈধ দোকান বরাদ্দ ও শেষ মুহূর্তের টেন্ডার জালিয়াতি: আর্থিক অনিয়মের এখানেই শেষ নয়, ডিএনসিসির সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের সময় বনানী কাঁচাবাজারের পাশে যেসব অবৈধ দোকান বাতিল করা হয়েছিল, এজাজ প্রশাসক হয়ে সেই ৩৩টি দোকান পুনরায় অবৈধভাবে বরাদ্দ দেন। ভুক্তভোগী দোকান মালিকদের অভিযোগ, প্রতি দোকান বরাদ্দ দিতে এজাজ ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন। এছাড়া পদ থেকে অপসারিত হওয়ার ঠিক আগের দুই মাসে (১১ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) অবিশ্বাস্য তড়িঘড়ি করে ৪৭টি মেগা টেন্ডার বা দরপত্র পাস করেন তিনি। ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান দায়িত্ব নেওয়ার পর সব খাত মিলিয়ে করপোরেশনের তহবিলে মাত্র ২৫ কোটি টাকা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন, অথচ বিদায়ের আগে ১২০০ কোটি টাকা রেখে এসেছেন বলে মিথ্যা দাবি করেছিলেন এজাজ।
যেভাবে উত্থান ও বর্তমান আইনি দশা: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোহাম্মদ এজাজ মূলত ‘রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিলেন। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ডিএনসিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক বনে যান তিনি। চেয়ারে বসেই মিরপুর-গাবতলী পশুর হাটের ইজারা জালিয়াতি, ই-রিকশা প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার, ফুটপাতে অস্থায়ী দোকান বরাদ্দ বাণিজ্য এবং খিলগাঁও তালতলা সুপার মার্কেটের পার্কিংয়ের জায়গায় নিয়মবহির্ভূত দোকান নির্মাণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
এসব অপকর্মের প্রেক্ষিতে গত বছরের ২৭ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এজাজের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে। এরপর চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি আদালত তাঁর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং এর এক সপ্তাহ পর ৯ ফেব্রুয়ারি তাকে পদ থেকে চূড়ান্তভাবে অপসারণ করা হয়। এ বিষয়ে বিশিষ্ট নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, "পদে থাকা অবস্থায় একজন প্রশাসকের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়া একটি বিরল ও নজিরবিহীন ঘটনা। দুস্থ মানুষকে সাহায্য দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এখানে কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র বা সঠিক তথ্য রাখা হয়নি, যা প্রমাণ করে এখানে ভয়াবহ দুর্নীতির গন্ধ রয়েছে।" তদন্ত প্রক্রিয়া যেন কোনো রাজনৈতিক প্রভাবে থমকে না যায়, সেজন্য দুদককে দ্রুত ও নির্মোহভাবে এই তদন্ত শেষ করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।