MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রাজনৈতিক হানাহানি, বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। গত দেড় বছরে এই জনপদে অন্তত ২৫টি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। প্রকাশ্যে গোলাগুলি ও খুনের এই ধারাবাহিকতায় পুরো রাউজান এখন এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্তত ১৮টি ঘটেছে সরাসরি রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে। সর্বশেষ গত শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে (৪৫)। ব্যস্ত বাজারে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুরো জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে খুনিদের রোমহর্ষক মিশন: পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যুবদল নেতা মাসুদকে হত্যার মিশনে সরাসরি অংশ নেয় পাঁচ অস্ত্রধারী। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে অস্ত্রধারীরা ব্যস্ত বাজারে আসে। ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাসুদকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কাছ থেকে প্রথমে গুলি ছোড়ে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাঁর বুকে ও মাথায় আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করা হয়। পরে বাজারে আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলি ছুড়ে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, হামলাকারী এই পাঁচজনই ওই অঞ্চলের কুখ্যাত ‘রায়হান বাহিনী’র সক্রিয় সদস্য। চিহ্নিত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন— রাউজানের কদলপুর এলাকার মোহাম্মদ ইলিয়াস প্রকাশ দামা ইলিয়াস, দিদারুল আলম প্রকাশ দিদার, রাউজান পৌরসভার ফরেস্ট অফিস এলাকার মোহাম্মদ ইউসুফ এবং রাউজান সদর ইউনিয়নের পূর্ব রাউজান এলাকার মোহাম্মদ জাহেদ ও মোহাম্মদ আবছার। এদের মধ্যে ইলিয়াস ও দিদারুল প্রথমে মাকসুদুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন এবং পরে বাকিরা ব্যাকআপ টিম হিসেবে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। উল্লেখ্য, এই রায়হান বাহিনী রাউজানের সাবেক এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চল ও অপরাধের নেপথ্য: নিহত মাসুদ রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপনের ছোট ভাই। তিনি আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। স্থানীয়দের ধারণা, কর্ণফুলী নদীসংলগ্ন কয়েকটি লাভজনক বালুমহাল ও বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ অথবা রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এই সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। হত্যাকাণ্ডের পর রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই এবং চট্টগ্রাম-রাঙামাটি আঞ্চলিক মহাসড়ক কয়েক ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, "মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ হত্যার ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে আসামি করে রাউজান থানায় একটি পরিকল্পিত হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ভিডিও ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িতদের আমরা শতভাগ শনাক্ত করেছি। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"
রাঙ্গুনিয়া-রাউজান সার্কেলের সহকারী পুলিশ顺 (এএসপি) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, অস্ত্রহাতে ভিডিওতে দেখা যাওয়া পাঁচজন রায়হান বাহিনীর তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, সন্ত্রাস, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও গোপন আস্তানা গড়ে ওঠায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, কারণ অপরাধীরা অপরাধ করেই পাহাড়ে আত্মগোপন করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এই অস্ত্রধারী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এখনই যৌথ বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থা না নিলে রাউজানের এই লাশের মিছিল ও সহিংসতার চাদর ছিঁড়ে ফেলা সম্ভব হবে না।