MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় নিখোঁজ হওয়া সাত বছরের এক শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের পর সন্দেহভাজন ঘাতককে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো এলাকা। উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে একদল বিক্ষুব্ধ লোক ‘মব’ (উত্তেজিত জনতা) তৈরি করে শিশু হত্যাকারী সন্দেহে আটক এক যুবককে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে এই চরম সহিংসতা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে গিয়ে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি), আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ২০ জন সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। বিক্ষুব্ধ জনতা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সরকারি গাড়িসহ প্রশাসনের সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে। এই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পর পুলিশ মূল অভিযুক্তসহ দুজনকে আটক করেছে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে আদিতমারী থানার ওসিকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত এই তুলকালাম কাণ্ড ঘটে।
ঘটনার নেপথ্য ও মব সৃষ্টি: নিহত শিশু নন্দিনী কান্ত রায় ফলিমারী গ্রামের নলিনী কান্তের মেয়ে। আর প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তি হলেন একই গ্রামের রণজিৎ কুমারের ছেলে বিধান চন্দ্র রায় (২২)। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, সোমবার (১৫ জুন) বিকেল থেকে হঠাৎ নন্দিনীকে খুঁজে পাচ্ছিল না তার পরিবার। মঙ্গলবার সকালে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বাড়ির পাশে একটি ভুট্টাক্ষেতে নরম মাটি দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে সেখানে গর্ত খুঁড়তেই নন্দিনীর বস্তাবন্দি লাশ বেরিয়ে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকসেবী বিধান চন্দ্র প্রতিবেশী শিশু নন্দিনীকে ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে মুখ বেঁধে ধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ বস্তায় ভরে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল।
এদিকে, সোমবার সন্ধ্যায় বিধানকে ওই ভুট্টাক্ষেত থেকে কোদাল নিয়ে ফিরতে দেখার তথ্যের ভিত্তিতে বিক্ষুব্ধ জনতা তার বাড়িতে চড়াও হয়। তারা বাড়ি ভাঙচুর করে ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিধানকে ধরে ফেলে। খবর পেয়ে আদিতমারী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিধানকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। কিন্তু উত্তেজিত জনতা আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে অভিযুক্ত বিধানকে নিজেদের হাতে এনে গণপিটুনি দিয়ে তাৎক্ষণিক বিচার করার দাবিতে একটি বিশাল ‘মব’ সৃষ্টি করে। তারা পুলিশকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে অবরুদ্ধ করে রাখে।
প্রশাসন অবরুদ্ধ ও সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ: উত্তেজনার খবর পেয়ে লালমনিরহাট জেলা পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান এবং ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থলে গেলে তারাও উগ্র জনতার তোপের মুখে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এরপর একে একে সদর থানা, কালীগঞ্জ থানা, জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ সুপারকে উদ্ধারের চেষ্টা চালালে পুরো গ্রাম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি শান্ত করতে জেলা প্রশাসক (ডিসি) রাশেদুল হক প্রধান এবং বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও প্রায় ৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকেন জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
একপর্যায়ে প্রশাসনের ওপর থেমে থেমে ইট-পাটকেল ও লাঠি নিয়ে হামলা চালায় বিক্ষুব্ধরা। শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং অবরুদ্ধ কর্মকর্তাদের উদ্ধারসহ অভিযুক্ত বিধান ও তার বাবাকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এ সময় তাদের ছোড়া ইটের আঘাতে এসপি আসাদুজ্জামান, আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হকসহ ২০ জন আহত হন এবং ডিসির গাড়িসহ সাতটি গাড়ি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
মামলা ও বর্তমান পরিস্থিতি: লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান নিজের আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল রূপ নিয়েছিল। আমি নিজেও ইটের আঘাত পেয়েছি এবং বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সরকারি কাজে চরম বাধা সৃষ্টি এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি কঠোর মামলা দায়ের করা হচ্ছে। এছাড়া উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে আদিতমারী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।"
ঘটনাস্থলে উপস্থিত জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, "নৃশংস এই শিশু হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে। অপরাধী বিধানের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।"